একটি ছেলে–“অনেক স্বপ্ন”

——তৌহিদা আখতার

অনেক রাত্রি । চোখে কিছুতেই ঘুম আসছেনা । দেয়াল ঘড়িতে টিক টিক শব্দ হচ্ছে । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি–রাত দু’টোর কাছাকাছি । শুয়ে শুয়ে অনাগত দিনের ভাবনাগুলো ভাবা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না । মাঝে মাঝে অতীতের কথাও মনে পড়ছে । কি ছিলাম । বার বার করে আবার মনে পড়ছে, কেমন থাকব । একবার ভাবলাম,বিছানা থেকে উঠে বাহিরে যাওয়া যাক । আকাশের তারাগুলোকে অনেকদিন দেখিনি । হয়তো তারাগুলোকে দেখে অনেকটা স্বস্তি পাব । হ্যাঁ, জীবনটা মানুষের বিষাদে ভরা থাকে যখন,তখন পৃথিবীকে ধোয়াটে আস্তাকুড় ছাড়া কিছুই ভাবা যায় না ।

দরজা খুলতেই,মা টের পেলেন,—-কে ?

মা,আমি । তোমার হতভাগ্য ছেলেটি ।

এত রাতে,কি করছিলি ? ঘুমাসনি ?

মাকে কি বলব, ভেবেই পাচ্ছিলাম না । হুট করে বলে ফেললাম মা অনেক ঘুমিয়েছি । আজ ঘুমটা গভীর ছিল কিনা,তাই তাড়াতাড়ি জেগে উঠলাম । তুই আমার কাছে লুকোতে পারবি না। সত্যি করে বল তোর কি হয়েছে ? না— মানে,আজকে আমার তাড়াতাড়ি বেরুতে হবে কিনা তাই । বাবা কোথায় মা ?

তোর বাবা এখনও ঘুমে আছেন । কেন ? ডেকে দেব ?

না থাক ।

আমার মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো । অসুস্থ বাবা, অনেক গুলো ভাইবোন, বৃদ্ধ মা । কি করব ভাবে পাচ্ছি না । কোন রকম এম,এ পাশ করেই একটা চাকরীতে যোগদান করলেই সব সমাধান হবে । ছোট একটি বোন । ও এবার আই,এ পরীক্ষা দিবে । আমার সঙ্গে ভার্সিটিতে পড়ে– রিয়াদ নামে ছেলেটি খুব ভাল না হলেও, মোটামুটি চলনসই । আচার ব্যবহার ভালই ।

আজকাল বোনদেরকে বিয়ে দেয়া কঠিন ব্যাপার । ভাল ছেলে নির্বাচন করাও সহজ না । কারণ সবখানে যে পরিবেশ—কে ভাল–কে মন্দ বোঝা মুস্কিল ।

ব্লাড টেষ্ট ছাড়া ভাল বলাই যায় না । কারণ ছেলেকে বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র মনে হলেও— তাদের খোঁজ নইলে দেখা যায় তারা মাদকাসক্ত । সত্যিই যুব সমাজের এমন অবস্থা দেখে খুব দুঃখ হয় । আমার মনে হয়, কেউ কেউ বড় ধরনের দুঃখ পেয়ে আসক্ত হচ্ছে । আবার কেউ কেউ ভাবছে একটু টেষ্ট করে দেখিনা কেন ? ক্ষতি কি ?

রিয়াদের আভ্যন্তরীন সকল বিষয় আমার জানা আছে । এইতো ছ’মাস পরেই আমাদের পরীক্ষা । পরীক্ষাটা দিয়েই আপাততঃ টিউশনি করব ভাবছি । বসে থাকার চেয়ে টিউশনি করাটা অনেক ভাল । তারপর রেজাল্ট হলেই তো ভাল একটা চাকুরী । বাবা,মা,ভাইবোন সবার মিখেই হাসি ফুটবে তখন । ভেবে কতই না আনন্দ লাগছে আজ । নীপাকে রিয়াদের বিয়ে দেব ভাবছি । এক সময় নীপাকে বললাম , বিয়ের ব্যাপারটা । নীপা বলল, তুমি যা ভাল বুঝ তাই করগে ।

এবারে নীপা আই,এ পরীক্ষাথীনী । পড়াশুনা ভালই করছে । আমার অনেক ভাইবোন হলেও মোটামুটি সবাই মেধাবী অষ্টম শ্রেণীতে নীপা দ্বিতীয় গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে । আবার এস,এস,সি তে চারটি লেটার সহ প্রথম স্থান অধিকার করেছে । বোনটি আমার সুশ্রী না হলেও সবদিক থেকে সুন্দরীই বলা যায় ।অন্য কেউ সুন্দর বলবে কিনা জানিনা । তবে আমি আমার বোন্টিকে সুন্দরীই বলব । কারণ যেমন ভদ্র,নম্র,সহজ,সরল তেমনি মেধা ও প্রতিভা রয়েছে গান গাওয়া থেকে শুরু করে—-ধর্ম কর্ম, এমনকি সে একজন লেখিকাও ।

এমন যুগে নীপার মত একটি মেয়ে তার ভাইয়ের মতামতে বিয়ে করবে , এটা যেন আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা ।

নীপা ! তুই তো বড় হয়েছিস , তোর মতামতেরও প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি । তোর কোথাও পছন্দ টছন্দ আছে নাকি ? আমি তো ভাইয়া , তোর দিকটাও তো আমাকে দেখতে হবে । তোমাকে তো বলেছি ভাইয়া , তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ । না , রে —– আজকাল ছেলেমেয়ে নিজের ভাল বুঝে নিজেই সবকিছু করে কিনা , তাই তোকেও জিজ্ঞেস করলাম—- তোরও পছন্দ টছন্দ থাকতে পারে তো ।

ভাইয়া ! তোমার ভার্সিটি কবে খুলবে ?

জানিনা , কবে খুলবে । অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ । দেখছিস না দেশে এত মারামারি , খুনাখুনি , ভার্সিটিতে রাজনৈতিক দলাদলি । লেখাপড়া কেমন করে করব আমরা ?

সব সময় ভীতি নিয়ে থাকতে হয়— এই বুঝি মারামারি বাঁধে । ছুটিতে রিয়াদের চিঠি লেখার কথা ছিল । আমাকে বলেছিল বাড়ী গিয়েই চিঠি লিখবে । বাড়ী ওর রাজশাহীতে । দু’ভাই,দু’বোন ও বাবা মা নিয়ে ওদের সংসার । অত্যন্ত স্বচ্ছল ওরা । বোন দু’জনের বিয়ে হয়ে গেছে । ও সবার ছোট । তাই ওকে নিয়ে বাবা , মার খুব আশা করাটা স্বাভাবিক । কারণ প্রত্যেকেরই বড় সাধ থাকে । কারও সাধ পূর্ণ হয় , কেউ ব্যর্থতায় তিলে তিলে জ্বলে যায় । এইতো নিয়ম ।

ভাইয়া ! রিয়াদ ভাই আমাদের বাড়ীতে আগে তো বেশ আসত এখন ভার্সিটি বন্ধ , তবুও আসছেনা কেন ভাইয়া ? ও হয়তো একেবারে আসবে বর সেজে ।

তুমি আমাকে লজ্জা দিওনা তো ভাইয়া । দুর পাগলী— এতে লজ্জার কি আছে । তুই জিজ্ঞেস করলি তাই ।

তোর পড়াশুনা কেমন হলো রে নীপা ?

ভালই । তবে ইংরেজীটা একটু বাকী আছে ।

মা কোথায় রে নীপা ? রান্নাঘরে । তুমি আজকাল আনমনা হচ্ছ কেন ভাইয়া ?

কই না- তো । কই , না তো বললেই হ’লো— আমি দিব্যি বুঝতে পাচ্ছি তুমি কেমন যেন আনমনা হয়ে যাচ্ছ।

না , — মানে ভার্সিটির কথা চিন্তা করে । দেখছিস না বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে , এম,এ সার্টিফিকেটের আশায় যখন সার্টিফিকেট পাব , তখন চাকুরী পাওয়া যাবে কিনা , সন্দেহ । তুমি চিন্তা করোনা ভাইয়া ! তোমার না হয় , আমার তো একটা চাকুরী হবে । তুমি যে দায়িত্বের কথা ভাবছ , সে দায়িতবটুকু না হয় আমিই নিলাম । ক্ষতি কি ? পৃথিবীতে মেয়ে হয়ে জন্মেছি জন্য , শুধু বসে বসে খাব তাতো হয় না ।

ভাইয়া ! আমার কি হয়েছে জান , মনে হয় এ পৃথিবীতে কখনই কারও দুঃখ অভাব থাকবেনা , যদি আমরা সবাই সবার বিপদে এগিয়ে আসি ।

হ্যাঁ , ঠিকই বলেছিস । জানিস নীপা , তোর কথা শুনে আমার ভীষন খুশী লাগছে । আবার মাঝে মাঝে চিন্তায় পড়ি । আমি আবার তোমার চিন্তার কারণ হ’লাম কেন ?

না ,— মানে , তুই সিরিয়াস্লি অন্যের দুঃখ অনুভব করিস তো , তাই ভাবছি । হয়তো সে কারণেই তোকে খুব চিন্তিত দেখি সব সময় । এত চিন্তা করলে তো স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়বে । পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে হ’লে নিজের দিকটাও ভাবতে হয় ।

ভাইয়া ! আজকে কেন জানি খুব আনন্দ লাগছে । গান গাইতে ইচ্ছে করছে ।

পাবি তো , গা না একটা গান । হারমোনিয়াম আমি ধরব ? না , থাক । নীপা প্রাণ খুলে গাইতে লাগল— সংকোচের বহবলতা নিজের অপমান । সংকোচের কল্পনাতে…… ।।

গান শেষ না হতেই দরজায় ঘন ঘন শব্দ হতে লাগল । নীপা এগিয়ে এলো দরজার কাছে । দরজা খুলতেই ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন— এটা কি খোকনদের বাড়ী ? হ্যাঁ– আমার ভাই খোকন । ডেকে দিন তো আপনার ভাইকে । দিচ্ছি । ভাইয়া , ভদ্রলোক তোমাকে চাচ্ছেন।

আমি এগিয়ে যেতেই , রিয়াদের ভাই একটা দুঃসংবাদ দিলেন । রিয়াদ নাকি গতকাল রাতে অ্যাকসিডেন্ট করেছে । হাসপাতালে দু’ঘন্টা অনেক চেষ্টা করেও সে আর বাঁচলো না । মৃত্যুর সময় নাকি খোকন , নীপা আরও কি যেন বলছিল ।

সংবাদটা শুনে আমি ঠিক থাকতে পারলাম না । বুক ফেটে যাচ্ছে আমার । কোন রকম বিমর্ষ ভাবটা সংযত করতে চাইলাম । কিন্তু পেলাম না । নীপার দৃষ্টিতে ধরা পড়লাম । নীপা অনেকক্ষন জিজ্ঞাসাবাদের পর —- অগত্যা বললাম ব্যাপারটা । যেমনি বলা– নীপা ছুটে গিয়ে বিছানার উপুড় হয়ে কান্না শুরু করলো । আকাশ বাতাস সব ধোঁয়াটে লাগল আমার কাছে । হাত , পা থর থর করে কাঁপতে লাগল । ক্রমশঃ চোখ বন্ধ হয়ে এলো ।

মাথায় অনেক দুঃশ্চিন্তা এসে জমালো ।

ভাবছি , এ বিশাল পৃথিবীতে সহজ , সরল , নীপা-রা কি সব দুঃখ ভুলে গিয়ে আগের মত করে বাঁচতে পারবে ?

More Stories
বাংলা আমার