পিঠা- ১

— মোঃ রবীউল করিম সরকার

রিস্কা থেকে বেডিং পত্র নামিয়ে ভাড়া মিটিয়ে মেসে প্রবেশ করলাম । সব ঘরের দরজা তালাবদ্ধ । কেবল একটি ঘরের দরজা ঈষৎ ভেজান । কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল । ঃআরে রাজু তুই ! তোর জন্যেই বসে আছি । ঃ তাই বুঝি ? তোরা সব কেমন আছিস । ঃ ভাল ! তুই ? ঃভালো ! খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি রে ? ঃ বিশ্রাম নে ! বিকেলে পার্কে বেড়াতে যাব । এর নাম মনো । পুরো নাম মণীন্দ্রনাথ রায় । আমার প্রাথমিক জীবনের বন্ধু । বরাবরই সে খুব বোখাটে টাইপের ছেলে । কেউ ওকে কখনও ভাল চোখে দেখত না । কিন্তু আমার সংগে তার আশ্চর্য মিল । ছাত্র হিসেবে সে কোন দিনই ভাল ছিল না । যত রকম শয়তানী বুদ্ধি ওর মাথায় কাজ করত । যে কোন পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার আশ্চর্য কৌশল ওর জানা আছে । পরীক্ষায় সে প্রায়ই ফেল করত । হেড মাষ্টারের বাসায় গিয়ে তাঁর পা জড়ায়ে ধরত , যতক্ষন না তাঁর পাশের স্বীকৃতি পেয়েছে ততক্ষন সে পা ছাড়ত না । আর একটা গুন তার ছিল যত বড় কঠিন কাজই হোক না কেন , অন্ততঃ একটা সিগারেটের বিনিময়ে তা করে নেওয়া যেত ।

অনেক চেষ্টায় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম । হষ্টেলে সিট নেই । তাই অন্ততঃ এক বছর বাইরে থাকতে হবে । ঠিক করলাম মেসে উঠব । মণীন্দ্র থাকত মেসে । তাকে চিঠি লেখায় সেই আমার জন্য ব্যবস্থা করেছিল । আপাতত ডবলিং । পরবর্তীতে সিট পাওয়া যাবে । যার নাকি গতি নেই , তার গতি এ মেসে আসলেই গতি হয় । মেসটির নাম অগত্যা মেস । নাম অবশ্য মণীন্দ্রই দিয়েছে ।

বেশ কিছু দিন কেটে গেল । মেসের পরিবেশ ভালই লাগছে । রান্নার জন্য একজন মেয়ে আছে । তাকে টকা দিলে বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না , ঘর পরিষ্কার ইত্যাদি সব কিছুই করে । মেয়েটা অত্যন্ত ভাল । ওর স্বামী হাঁপানি রুগী । পৃথিবীতে কোন কাজই চলনসই নয় – কেবল তিরিক্ষি মেজাজ ও উর্ধ শ্বাসে গাঁজা টানতেই সে পাকা । যে করেই হোক আর যেমন করেই হোক – গাঁজার টাকা তার চায়ই – বউয়ের উপর এটা তার একমাত্র দাবী । গাঁজার সংস্থান করতে না পারলে বউকে সে বেদম প্রহার করে । তাদের একটি মাত্র মেয়ে নাম পুঁটি । আমাদের মেসে তার পুঁটির মা বলেই পরিচিত ।

পুঁটির মা ছিল খুব অল্পভাষী । ছিন্ন ও মলিন শাড়ীর আবরণে তার আঠার উনিশ বছরের যৌবন টাকে মেসের ছেলেদের রান্না , তার সংসার ও স্বামীর গাঁজার সংস্থানের সেবায় নিয়োজিত রেখেছিল ।

পুঁটি ! মেয়েটির নাম পুঁটি হলেও তার আবদার , চাওয়া – পাওয়া সব কিছুই ছিল রাজকীয় । তার ভাল জামা চাই , ভাল খাবার চাই , জুতা চাই , বই চাই আরও কত কি চাই – কিন্তু কোন আব্দারই তার পূরণ হত না । তাই সে মাকে অসম্ভব জ্বালাতন করত । অসহ্য মাতা মাঝে মধ্যে পিঠে বক্সিং দিত । শেষে উভয়েই বসে বসে কাঁদত । মেয়েটির আবদার কিন্তু তাতে কিছুতেই প্রশমিত হত না । কারন তার পাশে সবাই যখন মার সংগে স্কুলে যায় , বিকালে বাবার সংগে পার্কে যায় – তার অপরাধ কি ? তার দাবী পূরণ হবেনা কেন ? তাই তার মায়ের কাছে তার আবদার বাড়েই চলত । তার রাজকীয় আবদারের জন্য আমি তার নাম দিয়েছিলাম ‘ইলিশ’ । সে ইলিশ , সামান্ন্য পুঁটি সে নয় ।

আমাদের মনো দা এ পুঁটিকে নিয়ে খুব রসিকতা করত । মেসের পাশে শিবুর দোকান ছিল । আমাদের মেসের জন্য পুঁটি ছিল সে দোকানের যোগ্যতম ক্রেতা । যে কারও সিগারেট , কাগজ , কলম, ইত্যাদি কিনতে হলে পুঁটির ডাক পড়ত । বিনিময়ে ছিল তার পাওনা পঁচিশ পয়সা । কিন্তু সে আরও চাইত । বিনিময়ে পেত একটা শক্ত ধমক ।

মনো কিন্তু পুঁটিকে খুব ভালবাসত । তাকে নিয়ে খুব রসিকতা করত । পুঁটি একবার কান্না শুরু করলে তাকে থামানো খুব শক্ত ছিল । যদি মনো থাকে তবে সে চট করেই থেমে যেত । আশ্চর্য মানুষ এ মণীন্দ্র । আশ্চর্য ক্ষমতা তার । মেসে অবস্থানকারী ছেলেদের অবস্থা তেমন কারোই ভাল ছিল না । মাঝে মধ্যে খাবারের তাই ভীষন কষ্ট হত । কিন্তু মনোর কৌতুক আর সুললিত কন্ঠের গান সবাইকে মাতিয়ে রাখত । তার কন্ঠে চিল অদ্ভুদ দরদ । এ কন্ঠ দিয়েই তার সিগারেট খাওয়া থেক্র শুরু করে অনেক কিছুই চালিয়ে নিত বন্ধুদের কাছ থেকে ।

একদিনের ঘটনা শিবুদার দোকানে আমাদের অনেক বাকী হয়েছে । শিবুদা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর এক টাকাও বাকী দেবেনা । আমরা সবাই হতাশ হয়ে বসে আছি । বোধ হয় আজ রান্নাই হবে না । এমন সময় মনো এসে হাজির । তাকে সব কথা খুলে বলার পর সে বলল , আমাকে অন্ততঃ এক টাকা দাও । ব্যবস্থা করছি ।

টাকাটা আমি দিলাম । সে চলে গেল । কিছুক্ষন পর দেখি কয়েকসের চাল , ডাল , ডিম , মরিচ , পেঁয়াজ , ইত্যাদি সব নিয়ে সে হাজির । আমরাতো অবাক । সে মিট মিট করে হাসসে। ঃ কি রে মনো ? কি করে সম্ভব হল ? সে বলল , আমি গিয়ে বললাম , শিবুদা তোমার কাছে কালকে একটা সিগারেট নিয়েছি । দাম দেওয়ার কথা খেয়াল ছিল না এই নাও ।

শিবুদা দাঁত বেড় করে সুন্দর হাসি দিয়ে টাকাটা গ্রহন করে । তার পর সব জিনিস নিয়ে আসতে গেলে শিবুদা বাধা দিয়ে বলে টাকা ?

আমি বললাম , পরশু দেব ? সে বলে অনেক বাকী আছে । আমি বললাম , সব দেব । কিন্তু সে নাছোর বান্দা । আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একটু গা টিপে দিলাম — তারপর ভুঁড়িতে কয়েকটা টোকা দিয়ে তাকে শান্ত করলাম ।

আমাদের মণীন্দ্রর প্রকৃতি এরকম কোন দুঃখই তাকে স্পর্শ করেনা । সব ব্যাপারেই তার হাসি এবং অন্যকে হাসানোর প্রয়াস দেখতে পাওয়া যায় ।

More Stories
বৃহস্পতি গ্রহ