বিনিময়

-খন্দকার তৌহিদা আখতার

রাতে বিছানায় শুয়ে পড়তে প্রচন্ত শব্দ কানে এল।

একি ব্যাপার !! যত রাত্রি ঘনিয়ে আসছে ততই যেন দূর থেকে ভেসে আসছে শব্দ।

আমি তখন খুব ছোট হলেও বুদ্ধিতে নাকি পাকা ছিলাম।

আমি বেলা’পা কে বললাম কোথাও হয়ত ডাকাত এসেছে।বেলে’পা আমাকে ধমক দিয়ে

বলল চুপ কর। তোর সব ন্যাকাম আমার ভাল লাগে না। বেলা’পার কথা শুনে আমি চুপ

করে রইলাম। সারা রাত এক রকম জেগেই কেটে গেল। ভাবলাম ভোর হতেই সব ঠিক হবে।

সকাল বেলা উঠেই আমার বয়েসী অনেকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মিলে দেখতে গেলাম।কিছু দূর গিয়েই দেখি অকেকগুলো একই রকম পোষাক পরিহিত লোক।

তাঁদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে অস্ত্র। কেউ কেউ হা-হা করে হাসছে।আর কেউ কেউ ফিস ফিস করে কি যেন বলছে। তাঁদের বিরাট আজদাহা চেহারা যেমনি দেখা ,তেমনি দে ছুট। কোন দিকে কে দৌড় দিলাম জানি না।

বাড়ি এসে মাকে বললাম,মা-মা পাশের গ্রামে অনেক গুলো আজদাহা চেহারার লোক দেখে এলাম।তাদের হাতে কি যেন অস্ত্র। কেউ কেউ হাসছে। কেউ কেউ ফিস ফিস করছে। আমরা যেমনি দেখা তেমনি ছুট দিলাম।

মা বললেন, তদেরকে কিছু বললোনা-তারা? আমি বললাম-না।

তার পর বিকেলে দেখি আমার এক ভাই উঠোনে কি সব গর্ত খনন করা শুরু করলেন। গর্ত খুড়ছে তো খুড়ছেই। আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাইয়া গর্ত দিয়ে কি হবে। ভাইয়া কোন জবাব না দিয়ে দ্রুত বেগে খুড়তেই লাগল। আবার প্রশ্ন করলাম, ভাইয়া !! বলনা ভাইয়া !! গর্তটাতে কি রাখবে। ভাইয়া বললেন তোকে মার দিব।

ভাইয়ার কথা শুনে আমি হাউ মাউ করে কান্না শুরু করলাম। সারা-বাড়ী আমার কান্নায় একাকার হয়ে গেল। মা-আমাকে অনেক কষ্টে থামালেন। ভাইয়াকে দেখি সবার উঠনেই একটি করে গর্ত খুড়ছে তো খুড়ছেই।যেন এতটুকও তার বিশ্রাম নেই।

ভাইয়াকে আবারো প্রশ্ন করলাম,ভাইয়া ! ভাইয়া ! এতগুলো গর্ত তুমি খুড়ছো কেন ভাইয়া !!

ভাইয়া, এবার একটু শান্ত গলায় বললেন- একটু পড়েই সব বুঝতে পাবি। সবার উঠোনে গর্ত খননের কাজও শেষ। অমনি গুলির আওয়াজ শোনা গেল প্রচন্ত ভাবে।

এবারে ভাইয়া সত্যি সত্যি, বেলা’পা সহ আমাদের ভাইবোন ও আমাকে পরীখায় ঢুকতে বললেন। আমি প্রথমটায় ঢুকলাম। ঢুকেই আমার মনে হলো – আমি যেন এ পৃথিবীতে নেই। দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। অন্ধকার পরীখা থেকে একটু পর পর আমি বেরিয়ে এলাম এবং আমাদের ঘরে বাবা ও মাকে দেখতে গেলাম। মা আমাকে ধমক দিয়ে বললেন – পরীখায় না ঢুকলে – পাকিস্তানি সেনাবাহিনী না-কি গুলি করবে।

আমি ভয়ে তৎক্ষনাত পরীখায় প্রবেশ করলাম। সারাদিন অনবরত গুলির হতে লাগল। মা আমাদের কানে তুলা লাগিয়ে দিলেন। পরীখায় ক’দিন রইলাম।

হঠাৎ একদিন পাশের গ্রাম থেকে হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে এলো এক ছেলে। সে সবাইকে বললো, আপনারা যে যেভাবে পারেন পালিয়ে যান শিগগির। পশ্চিমবাহিনী আমাদের গ্রামে ধুকে পড়েছে। তারা সুন্দরী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আপনারা দেরী করছেন কেন ? তাড়াতাড়ি কেটে পড়ুন।

সংবাদ পাওয়া মাত্রই – আমার চাচী, ভাবী, বোন,ভাই মিলে সবাই ছুটতে শুরু করলাম পূর্বদিকে। শত্রুপক্ষ ছিল পশ্চিম দিকে। আমরা ঠিকানাবিহীন ভাবে ছুটতে লাগলাম। প্রায় দু’থেকে তিন শত লোক ছুটতে লাগলাম। বেলা’পা মাঝে মধ্যে আমাকে কোলে নিচ্ছেন, আবার দৌড় দিতে বলছেন। আমাদের মধ্যে একটি ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে একটা পুরো আঙ্গুল খসে পড়লো , রক্তের বন্যা বয়ে যেতে লাগল। ছেলেটির যেন সে দিকেও ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হাতটিকে অন্য হাতে ধরে নিয়েই ছুটতে লাগল। যেন কারবালার প্রান্তর।

আমি দৌড় দিচ্ছি তো দিচ্ছিই। আমার কানের পাশ দিয়ে , আবার মাথার উপর দিয়ে আর হাতের কাছ দিয়ে গুলি চলে যাচ্ছে। দয়াময়ের দয়ায় হয়তো সে দিন বেঁচে গেছি। নইলে কি যে হতো। বাংলার আকাশটা দেখতেই পেতাম না। ছুটতে ছুটতে আমরা প্রায় সন্ধ্যায় এক বাড়ীতে গিয়ে উঠলাম। বাড়ীটি ছিল বেশ বড়। বাড়ীওয়ালা আমাদের পরিচয় নেয়ার পর অত্যন্ত সুন্দর ভাবে আপ্যায়ন করলেন। আমাদের কে থাকতে দিলেন। যেমন শীতকাল ছিল, তেমনি লোকের দৌড়। তবুও গৃহকর্তা ও বধু এতটুকু অসুবিধে হতে দেননি। রাতে কারও যেন চোখে ঘুমের লেশটুকু নেই। সবাই চিন্তিত।

বাবা হাজারো গোলাগুলির মধ্যেও বাড়ীতেই আছেন। তিনি আমাদের সাথে পালিয়ে আসেন নি বলে,বাবার চিন্তায় আমরা আচ্ছন্ন। রাতে কে, একজন বলে গেলেন – আমাদের পাড়ায় দুজন লোক মারা গেছেন। শুনে সবাই দয়াময় কে ডেকে কেঁদে অস্থির। ভোর হতেই গৃহকর্তা আমাদের বাড়ীর সংবাদ নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। সকালেই সংবাদ এলো। সবাই ভালো আছে। ছোট চাচাকে বাবা পাঠালেন – তারপর আমরা চাচার সাথে আমরা এক দাদুর বাড়ীতে গিয়ে উঠলাম। সেখানেও মন টিকছেনা।

চারদিকে শুধু মৃত ব্যক্তির রক্তে রঞ্জিত। আমাদের পাশের গ্রামে মোহন ও বিলাস ভাই ছিলেন নীতিবান, তেমনি ছিলেন যোদ্ধা। পাড়ায় কোন বিবাদ বাঁধলে তারা তার সুষ্ঠ সমাধান করে দিতেন। বিপদে আপদে সবার পাশে এসে দাঁড়াতেন। মোহন ও বিলাস দু’জন সহোদর ভাই ছিলেন। তাঁর বাবা – মা খুবি আদর করতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবার ইচ্ছে মোহন ও বিলাস বড় হয়ে সানাবাহিবী হোক। সত্যিই তাঁর বাবার ইচ্ছে দয়াময় কবুল করে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। আর তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন সে যুদ্ধে। যুদ্ধ তো নয় একেবারে মখোমুখি সংঘর্ষ। দাদুর বাড়ী থেকে দশ দিন পর ফেরে এসে দেখি বাড়ীটার রং বদলে গেছে। মোহন ভাই, বিলাস ভাই কেউ ওরা বেঁচে নেই। চারদিকে বিশাল শুন্যতায় ছেয়ে গেছে। তবুও দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার নামেই যেন মোহন ও বিলাস ভাই টিকে আছে।


More Stories
লবণের কেজি ১২০ টাকা !!