রাজ নগরের উপাখ্যান

—- আহমেদ রুহুল আমিন

পর্ব ২

কসাই পট্টীর পিছনের জায়গাটা পরিত্যাক্ত , আবর্জনা ও গোরুর মল ফেলা সরকারী খাস জমি । আপাতত থাকার জায়গা করে দিয়েছে চেয়ারম্যান ময়েজ উদ্দীন । সুবিধে সারারাত বাজার পাহারা দেয়ার । পুরোনো দু – চালা একটা খড়ের ঘর তুলেছে হেকমত ।

সন্ধ্যার অনেক পরে ঘর থেকে বার হয় হেকমত । হাতে টর্চ , লাঠি নিয়ে বাইরে এলেই ব্যাপারীর গলার আওয়াজ শুনে । জোরে জোরে কথা বলে ব্যাপারী ।

ঃ কিরে শালা হেকু । এখন বাইর হস । রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে । হেকমত বোকার হাসি হাসে । এই শালা শোন । তোর বউটারে কাল দেখলাম । কি সুন্দর একখানা চাঁদের পরী বিয়ে করছস । চল বউটার হাতের পান খাওয়া ।

হেকমত নিয়ে যায় । পেছনে হেঁটে ঘরে ঢুকে ব্যাপারী । দুষ্টমীর হাসি হাসে বুড়ো । একটা পঞ্চাশ টাকার নোট গুজে দেয় হেকমতের পকেটে । হেকমত কানে কানে কি যেন বলে বউ আমিনাকে , তারপর বাজারে চলে যায় ডিউটিতে ।

দিন গড়িয়ে যায় । পৃথিবীতে যে কত রকমের কান্ড ঘটে এতদিনে । হেকমতের অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয় । তাকে কেমন যেন রহস্যময় মনে হতে থাকে লোকজনের । নাকি – পাপ কথা ছাপা থাকেনা বলে লোকের সন্দেহ এখন মনে অন্য রকম ঠেকে । কোন এক সময় হেকমতের চোখে সবাই ব্যাপারী হয়ে যায় । লোকে তাই দরবার ডাকে ।

বিচারের দরবার বণিক সমিতির ঘরে । রজব আলী ব্যাপারী পুরোভাবে । উঁচু গলায় নাকি স্বরে কথা বলে ব্যাপারী ।

ঃ আমরা যা দেখতেছি , – যা শুনতাছি , বাজারের মধ্যে খারাপ কাম । ব্যবসার জায়গায় জেনা চললে ব্যবসা ধ্বংস । তাই এই শালা – হেকমতেরে বাজার থেইকা বাইর কইরা দিতে হবে । কি ভাইরা খারাপ কিছু বললাম নাকি ? – লোকে সমস্বরে সমর্থন দেয় । হেচড়া পোলা পান শীষ কাটে ।

চেয়ারম্যান ময়েজ উদ্দীন উঠে গিয়ে হেকমতের কান ধরে । হাত দিয়ে কষে থাপপর লাগায় দু – গালে । শালা ঃ এই জন্য তোকে বাজারে জায়গা দিছি নাকি । যা আমার কাছে তোর জায়গা নাই । দরবার ভাঙ্গে । পৃথিবীতে ছিন্ন মানুষের শেকড়হীন হয়। কেউ কেউ খারাপ হয় । বউ – মেয়েরা নষ্ট হয় । বাস্ত ভিটে হতে বিতাড়িত হয় । কাজ হারায় । ফুটপাত , পরিত্যাক্ত জায়গায় বসবাস করে । আবার বিতাড়িত হয় । আবার জায়গা পায় , কাজ পায় । কি ভাবে পায় তা বলা মুশকিল । অসাম্যের পৃথিবীতে কত শেকড়হীন মানুষের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয় । হেকমতদের একটা থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায় । শহরের কাছেই তবে বাজার হতে কিছু দূরে ।

বাজার থেকে উত্তরে কয়েকটা রাস্তা বস্তির ভেতর ঢুকেছে । সোজা উত্তরে গেছে একটা । ওদিকে খুব একটা ঘর বাড়ী নেই । নতুন ডিষ্ট্রিক্ট হয়েছে বলে দোলা – আবাদী জমি খাস হয়েছে । অফিস , আদালতের বিল্ডিং উঠছে কতগুলো । দোচালা খড়ের ঘর মাটিতে ঠেকিয়ে আপাততঃ তারই ভেতর বউ ছেলে নিয়ে রাত কাটায় হেকমত । বিল্ডিং এর যোগানদারের কাজ করে বউ সহ ।

বড়ো বয়সে খাটতেও পারে মানুষটা । পয়সা সব সয়সা ! পয়সা এলে কে খাটবেনা ? পয়সা মানুষকে বয়স বুঝতে দেয়না । পয়সা হলে কি চোখের নজর খারাপ হয়ে যায় । না হলে বুড়ো বয়সেও লোকটার স্বভাব বদলায়না কেন ? বাজারের লোকজন বলে –

ঃ মহাজন এলা ক্ষ্মা দেন । ছেলেরে বসান গদিতে । শুনে রজব আলী হাসে । মোটা শরীরটা ডালের বস্তায় ঠেসদিয়ে বসে । একটা বিড়ি ধরিয়ে বিড়ির মোঠা এগিয়ে দেয় সবার সামনে । বলে – ছেলেরা কারবার বুঝেনা , কিন্তু আপনি মরে গেলে ? সেটা পরে চিন্তা করুম । একটা কথা বুঝনা কেন তোমরা –

দোকানে না বসলে আমি অমনি এমনিই মরে যাব । বারো বছর থিকা কারবার করি । চোকে নগত টাকা না দেখলে রাতে ঘুম আসেনা ।

কথা শুনে লোকেরা হাসে । ভালো কথা বলেছেন মহাজন । আলাপে আলাপে রাত অনেক হয়ে যায় । মকবুল দোকানের ঝাপ ফেলে । দোকানিরা একে একে চলে যায় । ব্যাপারী টাকা গুনে । গুনে গুনে লোহার সিন্দুকে রাখে । তারপর দোকানের তালা লাগায় মকবুল । ব্যাপারীর হাতে চাবি দিয়ে পেছন পেছন হেঁটে যায় ।

আজ আর বাসায় যায়না ব্যাপারী । সোজা উত্তরের রাস্তা ধরে এগুতে থাকে । মকবুল বুঝতে পারে আজ বড় খারাপ মতলব ব্যাপারীর ।

More Stories
বাংলা আমার