রাজ নগরের উপাখ্যান

—– আহমেদ রুহুল আমিন

পর্ব – ১

জাবরকাটা গোরুর মতো পান চিবোয় রজব আলী ব্যাপারী । পিচ করে পানের পিক ফেলে পিট পিট করে তাকায় নুতন উচিছষ্ট আমদানীর প্রতি । ওরা পেরিয়ে যায় সামনে দিয়ে । একজনকে দেখে চোখে শক লাগার মতো অবস্থা বুড়োর । একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ ধরে দৃষ্টির সীমারেখা পর্যন্ত ।

মোটামটি বড় রকমের বাজার এই জেলা সদরের রাজ নগর বাজার । সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো সব দোকান গুলো । গালামাল , মনোহরি , কাপড় , জুতো , কাশন-বাসন, তরকারী পট্টি সব কিছু আলাদা ভাবে সাজানো । রোববার , বুধবার হাটবার ছাড়াও প্রত্যেক দিন লোক জন ক্রেতার ভীড় লেগেই থাকে । শুধু শুক্রবার দিনটা বন্ধ থাকে । ব্যবসার পাশাপাশি ধর্ম কর্মরত একটা দিক থাকে । এ ব্যপারে বণিক সমিতির কড়াকড়ি ভূমিকা পালন করে । কেউ দোকান খুলে থাকলে এক ঘরে কিংবা জরিমানা হয়ে যায় ।

গালামালের হোল সেলার দোকান , বাজারের বড় মহাজন রজব আলী ব্যাপারী । কালো কুচকুচে চেহারার মুখ অনেক আগের কয়েকটা বসন্তের দাগ আধ বুড়ো লোকটার । বসন্ত শেষ হয়েছে অনেক আগেই , কিন্তু বসন্তের আমেজ এখনও কাটেনি । বাড়ীতে দু-দুটো বউ। ছেলে পুলে প্রায় পাঁচ ডজনের কাছাকাছি। তবুও রাস্তার দিকে নজর হরহামেশাই । এই এক নেশা মানুষটার । আরেকটা নেশা রয়েছে মানুষটার তা হল টাকা গুনে গুনে জমানো ।

সন্ধ্যার পর বাজারের প্রায় দোকান্দাররা আসে রজব আলীর দোকানে । গল্প গুজব চা পানি হয় । সুখ দুঃখের কথা বলে । মাল কেনার টাকা টান পড়লে ধার দেনা নেয় । বড় ভালো মানুষ রজব আলী বেপারী । লোকের বিপদ বুঝে সাহায্য করে । লোক আসেও তার কাছে । আসবেই না বা কেন । বাজারের পয়সাওলা মহাজন । দেদার পয়সা বানিয়েছে স্বাধীনতার পর । ঝানু ব্যাবসায়ী । ঝোপ বুঝে , কোপ মারে । অথচ এর আগে পাকিস্তান পিরিওডে , যে লোক নিজের কাঁধে ফেরী করে বেড়িয়েছে গ্রামে-গ্রামে । সে লোক স্বাধীনতার পর কেমন পেট ফুলিয়ে ফেললো । কথায় কথায় উদাহরণ কাটে লাল চান এক সাথেই পাড়ি জমিয়েছিল নদী ভাঙ্গনের পর সুদূর ঢাকার বিক্রমপুর থেকে । নোঙ্গর ছেড়া নৌকোর মতো শেষ মেষ উত্তর বঙ্গের এই পর্যন্ত মফস্বল অঞ্চলে । ব্যাপারীর এই অবস্থার চাবী কাঠি লাল চানের জানা আছে । ফুটপাতের দোকানী লাল চান স্বপ্ন দেখে জেগে জেগে । যদি ব্যাপারীর মতো তারও ভাগ্য একটুখানী খুলে যায় ।

আড্ডা শেষ হলে দোকানের ঝাপ বন্ধ করে মকবুল । বড় ঘুম কাতুরে মানুষ । রজব আলী ব্যাপারী বান্ধা কাজের মানুষ । দু আড়াই মনী বস্তা পিঠে করে বয়ে আনতে পারে । সারাদিনের পরিশ্রমের কারণে ডালের বস্তার পাশে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমায় । দোকানে তখন বেজায় আড্ডা । আড্ডা শেষ হলে রজব আলী ডাকে— মকবুল দোকানের ঝাপ বন্ধ কর ।

নাক দিয়ে কথা বলার অভ্যেস বুড়োর । ঘুম চোখে মকবুল ঝাপ বন্ধ করে , তারপর আবার গিয়ে শোয় । মকবুল শুয়ে পড়লে হিসেবের খাতা খোলে রজব আলী ব্যাপারী । মোটা বলপেন দিয়ে যত্ন করে হিসেব লেখে । ক্যাশ বাক্স থেকে টাকা বের করে অনেকটা সময় ধরে গোনে । বারবার গোনে সাজায় । বান্ডিল ধরে তারপর ফেলে রাখে লোহার সিন্দুকে ।

রাতের বেলা ভাল ঘুম হয়না রজব আলী ব্যাপারীর । এমনিতেই একটু রাত করেই শোয় । দোকান থেকে আসতে দেরী হয় প্রায়ই । আজও ব্যাপারীর ফিরতে দেরী হয় । দোকান বন্ধ করে বের হয়ে সোজা চলে যায় কসাই পট্টির অন্ধকার গলির রাস্তা দিয়ে । পেছনে যায় মকবুল । বুড়োর মতলব খারাপ টের পায় সে ।

মাত্র কয়েকদিন আগে এখানে এসেছে কানঠসা হেকমত । বাজারে এসে দুর সম্পর্কের আত্নীয় চেয়ারম্যান ময়েজ উদ্দীনের হাতে পায়ে ধরে একাটা কাজের যোগাড় করে নিয়েছে সে । রাতের বাজার পাহারাদার না হলে বউ ছেলে মেয়ে সহ না খেয়ে মরতে হতো। চাঁদের পরীর ন্যায় বউটা তিনবার বিয়ানোর পরও শরীরের আকর্ষণ এতটুকু হারায়নি। কাঁচা হলুদ রং এর শরীর ও মুখের দিকে তাকিয়ে হু-হু করে উঠত বুকটা হেকমতের । গ্রামের ভীটে বাড়ী মহাজনকে দখল দেয়ার পর কাজের তাড়নায় ঘুরেছে অনেকখানে । কোথাও একটা কাজের সন্ধান মিলেনি । শহরের কথা বলছিল লালচান । গ্রামে ফেরী করতে গিয়ে পরিচয়।

More Stories
বৃহস্পতি গ্রহ